ক্ষমতার দাপটেই সাখাওয়াত জেলে

সভা-সমাবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও শামীম ওসমান ও তাঁর ভাই সেলিম ওসমান সেসব নির্বিঘ্নেই চালিয়ে যাচ্ছেন।

38

ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের পথে সাইনবোর্ড মোড় পার হলেই নারায়ণগঞ্জ–৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের নানা ‘কীর্তি’ চোখে পড়ে। তিনি অতি উৎসাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ভাস্কর্যও নির্মাণ করেছিলেন সাইনবোর্ড মোড়ে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন না করায় সেটি ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। সামনে এগোতে থাকলে চোখে পড়বে তাঁর নামাঙ্কিত বিভিন্ন ফলক। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগে প্রার্থীদের সভা-সমাবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও শামীম ওসমান ও তাঁর ভাই সেলিম ওসমান সেসব নির্বিঘ্নেই চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচনী ক্যাম্প উদ্বোধনের ছবিও ছাপা হয়েছে স্থানীয় পত্রিকায় (যুগের চিন্তা, ২৪ নভেম্বর)। নারায়ণগঞ্জে একটি কথা চালু আছে, এখানকার প্রশাসন সরকারের কথায় চলে না, চলে ওসমান পরিবারের কথায়। ডিসি–এসপি যে–ই আসুন না কেন, বক্তৃতা শুরু ও শেষ করেন তাদের বন্দনা দিয়ে।

নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ভ্রাতৃ শিবিরে যখন সাজ সাজ রব, তখন বিএনপির শিবির একেবারে নীরব। গায়েবি মামলার ভয়ে বেশির ভাগ নেতা-কর্মী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তফসিল ঘোষণার পর কোনো মামলা না হলেও পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

আগে গ্রেপ্তার, পরে নাশকতার মামলা

কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে মামলা হবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু বিএনপির জেলা সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খানের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টোটা। গত ৫ নভেম্বর বিকেল ৫টায় গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে আটক করে। আর যে কথিত নাশকতার মামলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, পুলিশের এফআইআর অনুযায়ী সেটি ঘটেছে ওই দিন রাত পৌনে আটটায়। মামলার এজাহার অনুযায়ী ৫ নভেম্বর বিএনপির ১৭৪ জন নেতা-কর্মী খালেদার মুক্তি ও তফসিল পেছানোর দাবিতে ফতুল্লার কাশিপুরে ভোলাইলের শেষ মাথায় নারায়ণগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ সড়কে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বিএনপির চার–পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে এবং বিএনপির নেতা সাখাওয়াত, সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিন, ফতুল্লা থানা বিএনপির নেতা আবুল কালাম আজাদ, মহানগর বিএনপির নেতা মোহাম্মদ হাসানসহ ১২০–১৩০ জন পালিয়ে যান।

দলীয় পরিচয়ের চেয়েও সাখাওয়াত হোসেনকে সারা দেশের মানুষ চেনে নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলার একজন সাহসী আইনজীবী হিসেবে। তাঁর দৃঢ় ভূমিকার কারণেই খুনিরা শাস্তি পেয়েছেন। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল যখন ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ সড়কের জালকুড়ি এলাকায় ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেনের প্ররোচনায় সাত খুনের ঘটনা ঘটে, তিনি তখন নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সভাপতি। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, নারায়ণগঞ্জের কোনো আইনজীবী খুনিদের পক্ষে আইনি লড়াই চালাবেন না। তিনি সভাপতির পদ থেকে চলে যাওয়ার পর সেই সিদ্ধান্ত রক্ষিত হয়নি; ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি’ হিসেবে পরিচিত অনেক আইনজীবী খুনিদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সাখাওয়াত হোসেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাদীর পক্ষে লড়াই চালিয়ে যান এবং আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করেন। হাইকোর্টের রায়ে নূর হোসেন, তারেক সাঈদসহ ১৫ জনের ফাঁসির দণ্ড হয়েছে। যে আইনজীবীর কারণে সাত খুনের বিচার হলো, তাঁকেই কিনা এখন গায়েবি মামলায় কারাগারে যেতে হয়েছে। যদি সাখাওয়াত সত্যিই নাশকতা করে থাকেন, তাঁর বিচার হোক। কিন্তু যে ঘটনা ঘটেনি, সেই গায়েবি মামলায় তাঁকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্য হলো ভোটের মাঠ থেকে তাঁকে দূরে রাখা, যাতে তিনি কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাতে না পারেন। এখানে মনে রাখা দরকার, মামলার ঘটনাস্থল ফতুল্লা—শামীম ওসমানের নির্বাচনী এলাকা। ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সাখাওয়াত ৯৬ হাজার ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে হেরে যান। নারায়ণগঞ্জের মানুষ মনে করেন, আইভী না হয়ে অন্য কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী হলে সাখাওয়াতই জিততেন।

কয়েক দিন আগে নারায়ণগঞ্জের নতুন পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেছেন, ‘অন্যায় মেনে নেব না, অন্যায়কারীদের প্রশ্রয় দেব না।’ এটাই কি অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় না দেওয়ার নমুনা?

আওয়ামী লীগ নির্ভার ও বিএনপি দোলাচলে

নারায়ণগঞ্জে পাঁচটি নির্বাচনী আসন। দশম সংসদে তিনটি আসন ছিল আওয়ামী লীগের, দুটি জাতীয় পার্টির। একাদশ সংসদেও মোটামুটি তা-ই থাকছে। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা প্রচারকাজও শুরু করে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি আনোয়ার হোসেন আলাপ প্রসঙ্গে বললেন, ‘আমরা আমাদের দল থেকে পাঁচটি আসনেই নৌকা চেয়েছিলাম। কিন্তু নেত্রী তিনটিতে নৌকা ও দুটিতে লাঙ্গল দিয়েছেন। আমরা তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি।’ নারায়ণগঞ্জে ‘নৌকার ভাই লাঙ্গল’। এটি রাজনৈতিক অর্থে যেমন, তেমনি পারিবারিক অর্থেও।

কিন্তু প্রার্থিতা নিয়ে বিএনপি এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় আছে। প্রতিটি আসনে দুজন কিংবা তার অধিক প্রার্থীকে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন দিয়েছে দল। চূড়ান্ত মনোনয়ন কে পাবেন, তা নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে নানা জল্পনা। নারায়ণগঞ্জ-১, ২, ৩ ও ৪-এ বিএনপিই বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ-৫–এ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দুই সম্ভাব্য প্রার্থী হলেন বিএনপির আবুল কালাম ও নাগরিক ঐক্যের এস এম আকরাম। দুজনই শক্তিশালী প্রার্থী। এস এম আকরাম ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করে সাংসদ হয়েছিলেন। আবুল কালাম বিএনপি থেকে তিনবার নির্বাচিত। নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে এস এম আকরাম সেলিম ওসমানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। সুষ্ঠু ভোট হলে হয়তো আকরামই জিতে যেতেন।

মনোনয়ন নিয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতাদের মন্তব্য: যেখানে নেতার ঘাটতি থাকে, সেখানে অন্য দল থেকে নেতা আনার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সদর আসনে তো বিএনপির সেই সমস্যা নেই। তবে তাঁরা এ–ও বলেন, দল যাঁকে ধানের শীষ দেবে, তাঁর পক্ষেই নেতা-কর্মীরা কাজ করবেন। বিএনপি এই নির্বাচনকে দেখছে ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি ও গণতন্ত্র উদ্ধারের’ আন্দোলন হিসেবে।

নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম বিএনপির নেতা আবুল কালাম ও আওয়ামী লীগের নেতা খোকন সাহার কাছে। তাঁরা বিপরীতমুখী বললেন। আবুল কালামের মতে, নির্বাচনের তো পরিবেশই নেই। দলের নেতা–কর্মীদের নামে এন্তার মামলা, মাঠে নামবে কীভাবে? আর খোকন সাহা মনে করেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। কেননা, প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীকে দেখাতে চান, দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।

নৌকা ধানের শীষ লাঙ্গল একাকার

বামফ্রন্ট শাসনামলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি কথা বেশ চালু ছিল। তরমুজনীতি। বাইরে সবুজ, ভেতরে লাল। অনেক কংগ্রেস নেতাই তখন বাম জোটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলতেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে লুকোছাপার কোনো বিষয় নেই। এখানে বিএনপির অনেক নেতাই ওসমান পরিবারের সঙ্গে আপসরফা করে চলেন। এটি তাঁরা স্বেচ্ছায় করেন না, বাধ্য হয়ে। প্রথমে বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। তারপর জেলখানা থেকে ছাড়িয়ে আনার শর্ত আসে ওসমান পরিবারের সব কাজকে সমর্থন দিতে হবে। বিরোধিতা করা যাবে না। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-৫–এর সাংসদ সেলিম ওসমানের মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সরকার সংস্থার জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলেও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউররহমান মুকুল অনুপস্থিত ছিলেন। সেলিম ওসমান তাঁর উদ্দেশে বলেন, ‘মুকুল,  তুমি কি লজ্জা পাও? তুমি দ্রুত আমার সঙ্গে যোগ দাও। না হলে ১ জানুয়ারি থেকে তোমাকে উপজেলা পরিষদে ঢুকতে দেওয়া হবে না।’ স্থানীয় বাসিন্দারা সুলতানসহ কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যানের নাম উল্লেখ করে জানালেন, তাঁরা সেলিম ওসমানের সমাবেশে যান বাধ্য হয়ে। জেল-জুলুমের হাত থেকে বাঁচার জন্য। নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দিয়েছেন, সবাইকে আচরণবিধি মানতে হবে। কিন্তু একজন সাংসদ ও প্রার্থী যখন আরেকজন জনপ্রতিনিধিকে উপজেলা পরিষদে ঢুকতে না দেওয়ার হুমকি দেন, তখন আচরণবিধি লঙ্ঘন হয় কি না, সেই প্রশ্ন তাদের কাছেই রাখলাম।