১০ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৪ গুণ

দীর্ঘদিন আদায় করতে না পারা যেসব ঋণ ব্যাংকগুলো অবলোপন করেছে, তার পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।

23

মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ২০০৯ সালে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আর গত সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৪ গুণ।

এর বাইরে দীর্ঘদিন আদায় করতে না পারা যেসব ঋণ ব্যাংকগুলো অবলোপন করেছে, তার পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের সঙ্গে অবলোপন করা এ মন্দ ঋণ যুক্ত করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা।

এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক তথ্য। তবে ব্যাংক কর্মকর্তারাই বলছেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণ আরও অনেক বেশি। অনেকগুলো ব্যাংক বড় অঙ্কের ঋণ আদায় করতে পারছে না, আবার তা খেলাপি হিসেবেও চিহ্নিত করছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকও এতে নজর দিচ্ছে না। এ ছাড়া শেয়ারবাজারের অজুহাতে প্রতিবছরই ব্যাংকগুলো নানা ছাড় নিচ্ছে। এতে করে খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্যও বেরিয়ে আসছে না। পাওয়া যাচ্ছে না ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্যের প্রকৃত চিত্র।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ চার দশক ধরে ব্যাংক খাতের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপির বড় ব্যর্থতা ছিল সন্ত্রাস দমন করতে না পারা। আর গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগের বড় ব্যর্থতা ব্যাংক খাতের অরাজকতা। এসব দূর করতে অর্থমন্ত্রীর তেমন জোরালো উদ্যোগ ছিল না। এ জন্য ঘটনা থেমে থাকেনি।’

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ আরও বলেন, ‘সরকারি ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রণের পুরো ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেওয়া হয়নি। এ জন্য দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও দুর্বলতা আছে, তারা সাহসই করতে পারছে না। খেলাপি ঋণের যে পরিমাণ বলা হচ্ছে, তার প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ।’

ব্যাংক খাত সূত্রগুলো বলছে, গত ১০ বছরে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম হলো সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক কেলেঙ্কারি। এ ছাড়া বেসিক ও ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতি, জনতা ব্যাংকের ক্রিসেন্ট ও অ্যাননটেক্স গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির কারণে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের ঋণ বেড়ে হয়েছে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, গত জুনে যা ছিল ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৩০ কোটি টাকা। আর ২০১৭ সাল শেষ থেকে ধরলে ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৫ হাজার ৬৭ কোটি টাকা।

তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৮০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩১ দশমিক ২৩ শতাংশ। গত জুন শেষে ছিল ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। এর মধ্যে ক্রিসেন্ট ও অ্যাননটেক্স গ্রুপের কারণেই জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ৪৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশই খেলাপি। গত জুন শেষে যা ছিল ৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বর শেষে বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের (কৃষি ও রাজশাহী কৃষি) খেলাপি ঋণের হার বেড়ে হয়েছে ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আর বিদেশি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৭ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম  বলেন, প্রতি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ একটু বাড়ে। এবারও বেড়েছে। ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ আদায়ে নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। ডিসেম্বর শেষে তা কমে আসবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক মইনুল ইসলাম এ নিয়ে বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় করতে হলে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণখেলাপিদের দেশে-বিদেশে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নজির তৈরি করতে হবে। এটা নির্ভর করে ক্ষমতাসীন সরকারের সদিচ্ছার ওপর। কিন্তু তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা ইচ্ছাকৃত খেলাপি হয়ে আছেন। তাঁরা কখনো ব্যাংকের ঋণ শোধ করবেন না। খেলাপি ঋণের অর্থ তাঁরা বিদেশে পাচার করে নিয়ে গেছেন।