শুন্যতার সহযাত্রী
গলাটা বারবার শুকিয়ে যাচ্ছে, তখন সূর্য পশ্চিম দিকে রক্তিম বর্ণ ধারণ করে প্রস্থানের জন্য অপেক্ষমাণ (ছোটগল্প)
৯৮

নাজমুল হাসান, লেখক ও সাংবাদিক দত্তপাড়া বাজারের মুখর পরিবেশ আর উপচেপড়া ভীড়ে রহিমুদ্দির মনোযোগ যখন বাংলা সিনেমার প্রয়োজনের অধিক মেদভূড়ি সমৃদ্ধ নায়িকার লম্ফ ঝম্ফ দেখায় ব্যস্ত, তখন বাইরে থেকে তার নাম ধরে অত্যন্ত ঝাঝাল গলায় হারাধন ডাক

দেয়-, এই রহিমুদ্দি…রহিমুদ্দি… বাইরে আয়। তুর সাথে কতা আছে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও রহিমুদ্দি বের হয়ে তাড়াহুড়ার স্বরে বলে কী কবু ক, সিনেমা দেকপো, ম্যালাদিন পর আয়েশ করে বসিছি।
হারাধন নিবিষ্ট মনে কিছু একটা ভাবল, তারপর গলার স্বর কিছুটা মোলায়েম করে বললো তুর সাথে পারসুনাল কতা আছে, একুনি কওয়া দরকার। তুরও এতে লাভ হবি।
লাভের কথা শুনেই চারপাচ দিন সেভ না করা মুখে রহিমুদ্দি টুথপেষ্টের বিজ্ঞাপনের ন্যায় হাসি ছড়িয়ে বলল ক ভাই লাভটা কি?
রহিমুদ্দির কথা শেষ হতেই আশপাশে সাবধানি পলক ফেলে হারাধন তার মুখ রহিমুদ্দির কানের কাছে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে এটি কওয়া যাবিনে। কল্যাম না পারসুনাল কতা। চল শান্ত জাগ্যা দেইখ্যা কোথাও গিয়ে বসি। হারাধনের কথার সম্মতি দিয়ে প্রায় পনের মিনিট হেঁটে দুজন বিসিকের উত্তর প্রান্তে নির্জন জায়গায় গিয়ে বসল। হারাধন পকেট থেকে বিড়ি বের করে নিজে একটা ধরিয়ে রহিমুদ্দির হাতে বিড়ি সমেত ম্যাচ দিল। বিড়ি ধরাতে ধরাতে রহিমুদ্দি তাগাদার স্বরে বলে ক, কি কবু? আমতা আমতা স্বরে হারাধন বলেে- না, মানে…বলিছিনু কি…হারাধনের আড়ষ্টতা দেখে রহিমুদ্দি ধমকের স্বরে বলে- এত মানে-মানের কি আছে? আরে শালা, আমরা হলাম ন্যাংটা কালের বন্ধু। আমাক কতে এত প্যঁচাচ্ছু ক্যা। বিড়িতে জোড়ে দম দিয়ে হারাধন একরাশ ধোয়া বাতাসে উড়িয়ে দিতে-দিতে বললো তুর ত অনেকগুলো খানেআলা, দুই বেলা-দুই মুঠো ভাত জুটাতে পারিস না। আর আমার মা’টা অসুখে ভুগিচ্ছে। টেকা পাইনা চিকিৎসা করাবার। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল হারাধন। তার পর আবার বলতে থাকলো একটা দান মারতে পারলে…

কথাটার অর্থ বুঝল না রহিমুদ্দি, তাই সে হারাধনকে জিজ্ঞেস করলো দান? কীসের দান? হারাধন কিছুটা চালাকি ঢংঙে বললো আছে, তুই আমার সাথে থাকবু কিনা ক?
দু’জন মিলে অনেক শলাপরামর্শ করল গভীর রাত অবধি।

সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন হারাধন আর রহিমুদ্দি বেড়িয়ে পড়ে হরিপুরের উদ্দেশ্য। বড় মাঠটা পেড়িয়ে বহু বছরের পুরনো পাকুড় গাছের নিচে চুপিসারে নিজেদের মধ্যে আরো কিছু প্রয়োজনীয় কথা সেরে নেয়। তারপর অত্যন্ত সন্তর্পণে তারা একটি বাড়িতে প্রবেশ করে। রহিমুদ্দির বুকের স্পন্দন দ্বিগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু সে তা হারাধনকে বুঝতে দেয় না। গলাটা তার বারবার শুকিয়ে যাচ্ছে। পথে আসতে-আসতে হারাধন তাকে অনেক অভয় দিয়েছে। বাড়ির উঠোনেই ভ্যান গাড়িটা পরিত্যক্ত চেইন দিয়ে বাধা অবস্থায় পড়ে আছে। হারাধন চারিদিক পরখ করে দেখল। রাতের নির্জনতা ছাপিয়ে পৃথিবীর মানুষগুলো অঘোরে ঘুমোচ্ছে। কোথাও কেনো সাড়াশব্দ নেই। হারাধনের ইশারা পেয়ে রহিমুদ্দি হাতে রাখা হ্যাক-স বে­ড দিয়ে চেইন কাটতে থাকে। প্রায় পনের মিনিট খরচ হয় তার কাজ সমাধা করতে। উৎফুল­ হারাধন এসে ভ্যানের নিয়ন্ত্রন নেয়। আর রহিমুদ্দি আগে আগে চলতে থাকে। একটু তাড়াহুড়া করতে গিয়ে ভ্যানটা পাশে রাখা পাটকাঠির সাথে সজোড়ে ধাক্কা খায়। তখনই কোত্থেকে যেন আচমকা কেউ বলে উঠে- ওই কে রে ওইখানে? শব্দটা রহিমুদ্দির কানে যেতেই সে ভো দৌড় দেয়। বেশ কিছুদুর দৌঁড়ে এসে রহিমুদ্দি ফিরে দ্যাখে হারাধন নেই। কিছু না ভেবেই সে হারাধনের উদ্দেশ্য পেছনে ফিরে গেল। একটু এগোতেই সমস্বরে শব্দ এলো ওই যে আরেকটা চোর, ধর…ধর…। ধর শালাক…মার শালাক…।
রহিমুদ্দি ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। কিছু বুঝে উঠার আগেই তিন-চারজন তাগড়া জোয়ান তাকে ধরে ফেলে।

পরদিন তাদের দেখা গেল দত্তপাড়া খাজা এন্টারপ্রাইজের সামনে নারকেল গাছের সাথে মোটা রশি দিয়ে পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায়। তাদের ঘিরে রয়েছে ছেলেবুড়োসহ জনাপঞ্চাশেক উৎসুক জনতা। চার-পাচ জন উঠতি বয়সের ছেলে হাতে লাঠিসোটা নিয়ে পাশে দাড়িয়ে আছে। ওদের মধ্যে একজন ভীড় ঠেলে একজন আগে হারাধন, পরে রহিমুদ্দির হাতে পায়ে কয়েক ঘা বসিয়ে দিলো। তৎক্ষণাৎ দুজনেই একসাথে কঁকিয়ে উঠল। একজন মুরব্বি ছেলেটাকে নিবৃত্ত করার জন্য বলে উঠল ওরে মানিক, ওত মারিসনা, মরি গেলে শেষ বিপদ হবি। মানিক প্রতিবাদীর গলায় বলল বিপদ! কিসের বিপদ? চোর মারলে কিসের বিপদ?

জনতার উপচেপড়া ভীড় সামাল দিতে দুচোর যাদের জিম্মায় রয়েছে তারা বেশ হিমসিম খেয়ে গেলো। তার মধ্যে আবার জনতার আচমকা ফুসে উঠল। জিম্মাদারদের একজন আদেশ দিলো, দু’চোর কে বাবুর বাপের স’মিলের কাছে নিয়ে যেতে। ওই যায়গাটা বেশ ফাকা। তার আদেশানুসারে তা-ই করা হলো। ক্রমেই বেলা বাড়তে থাকল।
এরই ফাঁকে একজন দয়া পরাবশত হয়ে দুটি বিস্কুট এনে রহিমুদ্দি ও হারাধনের হাতে ধরিয়ে দিলে রহিমুদ্দি গোগ্রাসে তা খেয়ে নিলো। হারাধন বিস্কুট হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে রইল। কিছুক্ষণ পড়ে সবার মাঝে গুঞ্জন উঠল, কেউ কেউ নিচু গলায় বলে উঠলো এই চেয়ারম্যান আসতিছে, সইর‍্যা দাড়া।
মধ্যেবয়সী আজাহার চেয়ারম্যান দু’জন রক্ষীসহ ঘটনাস্থলে হাজির হলে তাকে দেখেই প্রথমে হারাধন, তার দেখাদেখি রহিমুদ্দি চেয়ারম্যানের পায়ে উপুর হয়ে কান্নাভেজা গলায় নিজেদের ক্ষমার জন্য আর্জি পেশ করে। রহিমুদ্দি এই ইউনিয়নের লোক। চেয়ারম্যান তাকে চেনে। কিন্তু হারাধন অপরিচিত মুখ। চেয়ারম্যান মুখ বিকৃত করে জনগনের উদ্দেশ্য বলল এই শালার ব্যাটা রহিমুদ্দি, ওক কাজ দিছিনু, শালা করল না। হারামজাদা… বলেই রহিমুদ্দির গালে পরপর কয়েকটা থাপ্পর বসিয়ে দিলো। তারপর দৃষ্টি পড়ল হারাধনের উপর। হারাধনের নিচু মাথার চুল ধরে টেনে তুলে চেয়ারম্যান বলল এই তুর বাড়ি কোন গাঁ? প্রশ্নের জবাবে হারাধন অস্ফুট স্বরে জানাল কাঞ্চননগর।
কদ্দিন ধরে চুরি করিস। এই প্রশ্নের কোন জবাব দিল না হারাধন। হঠাৎ তার মুখ ফোসকে বেড়িয়ে যাওয়া কথায় জানা গেল, সে প্রবাল চাটুয্যের মাসতুতো ভাই। জনতার মাঝে পুনরায় গুঞ্জন শুর“ হল। কথাটি মুহুর্তেই প্রবাল চাটুয্যের কাছে পৌঁছুল। কিছুক্ষণপর প্রবাল চাটুয্যে মটরসাইকেল নিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হলে তাকে দেখেই চেয়ারম্যান তটস্থ হয়ে তার উদ্দেশ্য বলল দেখোতো বাপু, এ নাকি তোমার মাসতুতো ভাই? ফ্যাকড়ায় পড়নু…
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ক্রোধে অগ্নিবর্ণ ধারণ করে প্রবাল চাটুয্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল হারাধনের উপর। তার চোখে মুখে চড় থাপ্পর দিতে দিতে চাটুয্যে বলে এই শালা, আমি কবে তোর মাসতুতো ভাই ছিলাম? শালা চোর। কাদল না হারাধন। শুধু নিঃশব্দে মারগুলো হজম করল। তার মুখ বেয়ে ফোটা-ফোটা রক্ত মাটিতে গড়িয়ে পড়লে জনগন বেশ উল্লাস বোধ করল! এর মধ্যে জনতা বেশ কয়েক দফা ফুসে উঠল। চেয়ারম্যানের ধমকে সবাই নিজেদের সংযত করল। এ সময় চেয়ারম্যানকে বেশ চিন্তিত দেখা গেল। থানায় ফোন করার কথা তার মুখে বার কয়েক শোনা গেল। এতে বঁাধ সাধলো মুরুব্বী টাইপের কয়েকজন লোক। তাদের মুখে ক্ষমার কথা উচ্চারিত হলো। জনগনও এতে সায় দিলো। ফের যদি তাদের দ্বারা চুরি সংঘটিত হয় তবে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে। এই মর্মে ওদের ছেড়ে দেয়া হলো।
তখন সূর্য পশ্চিম দিকে রক্তিম বর্ণ ধারণ করে প্রস্থানের জন্য অপেক্ষমাণ। হারাধন আর রহিমুদ্দিকে ছেড়ে দিতেই দুজন দুই দিকে খোড়াতে খোড়াতে জনতার অগ্নিদৃষ্টির বাইরে চলে গেল।

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More