পাখিয়াল- মঈনুল হাসান
একটা সতর্ক চাপা আওয়াজ পেছনের ঝুলবারান্দার ছায়াময় কোণে এসে থেমে গেল এবার
৬৪

মল্লিকবাড়ির পেছনের উঠানে পাঁচিলঘেঁষে একটা পানাপচা পুকুর। তার শ্যাওলাবিছানো ঘাটে একটা জলপাই রঙের ঘুম আয়েশ করে জেঁকে বসেছিল অনেকদিন। সেদিক থেকেই শব্দটা হেঁটে হেঁটে এলো। শুকনো পাতার ওপর প্রথমে সড়সড় শব্দ। তারপর থেমে যায় হঠাৎ। কোনো সরীসৃপ বুঝি বুকে হেঁটে দম নেয় খানিক। একটা সতর্ক চাপা আওয়াজ পেছনের ঝুলবারান্দার ছায়াময় কোণে এসে থেমে গেল এবার।

সন্ধ্যা নামছিল ওপারের হিজলগ্রামে। কিচকিচ করে আকাশে একপাল বক উড়ে যেতেই আবারও শব্দটা হলো। একটু পর পর থেমে থেমে। আর তা ঘরের ভেতরে রোমেন মল্লিকের নিস্পন্দ অনুভূতিতে এসে লাগে। হালকা অস্বস্তি নিয়ে সাথে সাথে তিনি শোয়া থেকে উঠে বসেন।

কে? কে ওখানে? দীপেন নাকি?

গলার স্বর চড়া হতেই বাইরের খচমচ শব্দ থেমে যায়। তবু একটা অন্যরকম উপস্থিতি তিনি অনুভব করেন। ঘাড় উঁচিয়ে পর্দার প্রান্ত টেনে ধরে আবারও হাঁকলেন।

দীপেন নাকি রে? কথা বলছিস না কেন?

অবশেষে কোনো প্রত্যুত্তর না শুনে রোমেন মল্লিক উঠে দাঁড়ালেন। জানালার শাদা পর্দা সরিয়ে বারান্দার কাছে আবছামতো একটা অবয়ব তিনি প্রথমে দেখেছিলেন। কেউ নয় ভেবে আবার যখন বেতের সোফায় বসতে গেলেন মনে হলো কেউ বোধহয় দাঁড়িয়ে আছে। এ তার ভ্রম নয় তো!

বাইরের উঠানে এখানে ওখানে ছোপ ছোপ অন্ধকার। ভেতরে আলো জ্বলেনি। তবু তিনি এবার দেখলেন। মাত্র কয়েক হাত দূরে একটি অল্পবয়সী ছেলে দাঁড়ানো। ছেলেটি কোত্থেকে এলো, বিষয়-বৃত্তান্ত কী কে জানে! পনের-ষোল বছরের হবে। মাথাভর্তি শনের মতো রুখো চুল। হালকা তিরতিরে হাওয়ায় তা কাঁপছিল; ঠিক যেমন ভেতরের শাদা পর্দা দুলছে পাখার বাতাসের ঝাপটায়। ফ্যাকাশে আলোয় যতটুকু বোঝা যায়, তাতে লালরঙা উসকো খুসকো চুল নিয়ে কেমন লক্ষ্মীছাড়া চেহারা ছিল তার।

রোমেন মল্লিক প্রথমে ব্যাপারটি খেয়াল করেননি। আর না করবারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তার বয়স পঞ্চাশোর্ধ্ব। আজন্ম বেখেয়ালি এ মানুষটি সংসারের প্রতিও ছিলেন যত্নহীন। শামসুন নাহার স্বামীর এ ধারার সাথে পরিচিত ছিলেন। তাই নিজ হাতে একাই সামলেছেন গোটা সংসার। স্বামী-সন্তানের মতো প্রাণঘাতী রোগও একদিন আপন হলো তার। ঠিক কবে থেকে যে এমন রোগের সাথে বসবাস করে আসছিলেন প্রথমটায় কেউ ধরতে পারেনি। শেষকালে কর্তার যখন খেয়াল হলো ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। বুকে ব্যথা আর প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে তিনদিন নিউমোনিয়ায় ভুগলেন। শেষে কাউকে তেমন শুশ্রুষার সুযোগ না দিয়ে অভিমানে সংসার থেকে চিরতরে ছুটি নিয়েছেন তিনি।

রোমেন মল্লিক স্ত্রী বিয়োগের শোক সামলে উঠতে পারেননি ঠিকমতো। তার দৈনন্দিন দিনযাপনে সেই কষ্ট এখনও দারুণভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মানসিক ধকল কাটিয়ে উঠতে কলেজ থেকে ছুটি নিয়েছেন মাসকয়েক হলো। একমাত্র ছেলেটা একটা চাকুরি নিয়ে শহরে থাকে। সেই থেকে তিনি একা- একদম একা।

রোমেন মল্লিক অন্যমনস্ক ছিলেন। তাই বারান্দার ঝাপসা আলোয় মাত্র কয়েক হাত দূরের ছেলেটিকে প্রথমে ঠিকমতো দেখতে পাননি। হয়তোবা তাকে দীপেনই ভেবেছিলেন- বয়সটা তার কাছাকাছিই তো! জানালার নকশাকাটা লোহার গ্রিলের এপার থেকে আশ্চর্য চোখে তিনি খুঁটে খুঁটে দেখছিলেন তার মুখ। গোধূলির পড়ন্ত আলোর তেজ কমেছে অনেক আগে। গাছগাছালির ফাঁক গলে একটা আলোর রেখা বারান্দায় এসে পড়ায় আর সে আলোর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকায় একটা কমলারঙা আদুরে আলো নেমে এসেছিলো তার দু গাল বেয়ে।

কীরে? নাম কী? এখানে কী কাজ তোর? মল্লিকবাড়ির কর্তা জিজ্ঞাসা করেন নরম গলায়।

ছেলেটি উত্তর না দিয়ে কেমন ড্যাবড্যাব চোখে চেয়ে থাকে। অমন বিষণœ আলোতেও তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ কালো চোখজোড়া কথার দ্যুতি নিয়ে জ্বলজ্বল করছে। ঠিক যেন মায়াভরা টলটলে গভীর জলের পুকুর। মুখটা শ্যামল, ধুলোবালি রঙের। পেন্সিল দিয়ে চিকন করে আঁকা ধনুকের মতো ভ্রু। গায়ের ময়লা হাতকাটা গেঞ্জিটা সিঁদুরে লাল। ওদিকে পরনের সবুজ লুঙ্গির বেড় কম হওয়ায় কেমন অগোছালো আঁটসাঁট করে বাঁধা। পরিপাটিহীন একটা বুনো ছেলে। তবে তার দিকে আপাদমস্তক তাকিয়ে রোমেন মল্লিকের মায়া হলো ভীষণ।

কথা বলছিস না কেন? তুই কি দীপেনের কাছে এসেছিস? ওর আত্মীয় কোনো?

না… মুখ ফুটে কিছু না বললেও ঘাড় নাড়িয়ে এবার সঙ্কোচে জবাব দেয় সে।

তবে? আর এখানে ঢুকলিই বা কেমন করে? অমন উঁচু পাঁচিল ডিঙিয়ে।

আগের মতোই নিরুত্তর ছেলেটা। রোমেন মল্লিক নিজেই বিড়বিড় করে ওঠেন, কী আশ্চর্য! দীপেন চলে গেছে সেই কখন। গেট তো আমিই লাগিয়ে দিয়ে এলাম। অমন ভারি লোহার গেট!

দুই.

মল্লিকবাড়ির বনেদিপনা আগের মতো নেই। বাড়িজুড়ে খাঁ-খাঁ বিষণ্নতা, এখানে ওখানে শূন্যতার প্রাচুর্য শুধু। জৌলুসহীন জনশূন্য সে বাড়ির উঠোন-বারান্দায় একদেহ একাকিত্ব নিয়ে হেঁটে বেড়ান রোমেন মল্লিক। তাকে সঙ্গ দিয়ে যায় নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়া বিশাল প্রাচীনত্ব। এ বাড়ি তাদের আদি ভিটে নয়। এককালে বিনিময় করে তার পূর্বপুরুষের কেউ বাড়িসহ প্রায় দুইশত বিঘা জমি বুঝে নিয়েছিলেন। সে জাঁকজমকের কিছুই অবশিষ্ট নেই এখন।

তার ঘরলাগোয়া বারান্দাটাও সাবেকি আমলের। প্রশস্ত টানা বারান্দার একধারে একটা আলিশান হেলানো চেয়ার। যেখানে প্রায়দিন বিকালে আয়েশ করে বসে তিনি একাকী সময় কাটাতেন। কিন্তু, কয়েক মাস ধরে সে রুটিনে বিঘ্ন ঘটছে। স্ত্রীর অবর্তমানে বাইরের গোটা পৃথিবীর নিকষ অন্ধকারটা এখন তার বারান্দায় জেঁকে বসে থাকে প্রতিদিন। সেখান থেকে তার দেহে-মনে-চোখে। চোখের তারায় আলো প্রতিফলিত হলেই তো কেবল দর্শন অনুভূতি হয়। তিনি তার সকল অনুভূতি হারিয়ে নিসাড় নিস্তব্ধতায় বসে দিনাতিপাত করেন আজকাল।

জমাট অন্ধকার এড়িয়ে যেতে চান বলেই দিনে দিনে বারান্দার চেয়ারে ধুলো জমেছে। তাছাড়া ইদানীং শরীর ভালো না থাকায় মাঝে মাঝে কেবল সন্ধ্যার দিকে বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। আকাশটা তখন ভীষণরকম স্বপ্নালু হয়ে থাকে। নানান রঙের ছটা। ঠিক স্বপ্নের মতো। সে চেহারা দেখে একটা মোহাবিষ্ট ভাবালুতা হানা দিয়ে যায় তার মনে। পেছনের উঠোনজুড়ে গাছগাছালির ডালপালায় কতশত পাখির কিচিরমিচির, নীড়ে ফেরার ব্যস্ততা। তাদের মধ্যে রোমেন মল্লিকের মতো একা কেউ নেই। বারান্দা থেকে সোজা নদী দেখা যায়। নামটা ঠিক এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। হয়তো বিশেষ কোনো নামও নেই। নদীটার জীবনও তার মতো বিশীর্ণপ্রায়। ছন্দ হারিয়ে চলতে ভুলে গেছে।

পাঁচিল টপকে আসা ছেলেটিকে লক্ষ্য না করার আরও কারণ থাকতে পারে। তিনি এখন চট করে অনেক কিছুই মনে করতে পারেন না। মনে করার যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও কিছুতেই যেন মাথায় আনতে পারেন না। হয়তো মাথায় আসছে কিন্তু মাথা ঠিকমতো কাজ করছে না বলে সে বার্তা যথাস্থানে প্রেরণ করতে হাঁপিয়ে উঠছে বারবার।

বাড়ির পেছনের উঁচু পাঁচিলঘেরা উঠানের কাছে ঝোপালো বন। কিছু সুপ্রাচীন গাছের ফাঁকে ফাঁকে বাহারি লতা-গুল্ম ঝোপও আছে। ওদিকটায় এখন আর কেউ যায় না। যাবেই বা কে? জনমনিষ্যিহীন বাড়ি। পুকুরটাও প্রায় পরিত্যক্ত। একসময় বেশ যত্ন-আত্তি করে গাছগুলো লাগানো হয়েছিল বোঝা যায়। কিন্তু এখন শ্রীহীন- বুনো পুটুসের ঝাঁঝালো জঙ্গল। বারান্দা সোজা একটা প্রকা- ডুমুর গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়ানো। ওটার কয়েকটি শাখা পাঁচিল ছাড়িয়ে বাইরে নদীর দিকে। ছেলেটা হাত উঁচিয়ে ওদিকটায় না দেখালেও এতক্ষণ পরে রোমেন মল্লিকের খেয়াল হলো ডুমুরের হেলানো শাখা ধরেই হয়তো ভেতরে ঢুকেছে সে। ওদিকটার পাঁচিলও খানিক ভাঙা। কোথাও ধসে গিয়ে অনধিকার প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে সবার জন্যে। আবারও একবার নাম জিজ্ঞাসা করায় এবার সাহস এনে ঘাড় নাড়িয়ে কাঁচুমাচু কণ্ঠে বলে, শালুক।

কী? শালুক? রোমেন মল্লিক যেন আত্মহারা হয়ে উঠলেন। উচ্চকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন, বেশ নাম তো তোর।

তা, দীপেন তোর কী হয় রে? তাকে খুঁজতে খুঁজতে বুঝি এদিকে… তা উদ্দেশ্য কী তোর?

না, কিছু হয় না। এমনি মাঠের ও-ধার থেকে এসেছি।

মাঠের ও-ধার থেকে? তাও এই ভর সন্ধ্যাবেলায়? ভূত-টূত নস তো?

কথা শুনে ফিক করে হেসে ওঠে শালুক।

রোমেন মল্লিক তখনও ঘরের এ পাশে দাঁড়িয়ে। জানালার পুরানো গরাদের ফাঁক দিয়ে কথা বলে যাচ্ছিলেন অনর্গল। এবার ভেতরের কাঠের সবুজ দরজার লম্বা ছিটকিনি আলগা করে বেরিয়ে গেলেন বারান্দায়। হাতে একটা ভারী লণ্ঠন। প্রকাণ্ড দরজার গায়ে হঠাৎ দলছুট বাতাসের একটা ঝাপটা হুমড়ি খেয়ে গেলো। বাতাসটা হুহু করে ঘরে ঢোকার মুখে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিলো তার শরীরে। তারপর নিয়মমতো ঢুকে গেলো ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে- দমবন্ধ গুমোট ভাবটা তাড়িয়ে নিয়ে গেলো এক নিমিষে।

সূর্য ডুবে গিয়ে একটা মানানসই অন্ধকার বারান্দাজুড়ে খেলা করছিল তখন। নদীর ধারে মাঠের কাছে তখনও কিছুটা আলো। তবে ভেতরের ঝোপ-ঝাড়ে দু একটা জোনাকির পিদিম নিভছে জ্বলছে। রোমেন মল্লিক আলো হাতে এতক্ষণে খেয়াল করলেন, শালুকের বাঁ হাতটা পেছনে আড়াল করে রাখা আর ডান হাতের কনুইয়ের কাছে ছড়ে গেছে।

ইস… এমন কীভাবে হলো?

পাঁচিলের ওপর উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গেছিলাম। একটু ব্যথাও পেয়েছি।

আরেক হাতে কী? মুঠোতে কী ধরে আছিস?

শালুক মাথা নিচু করে মুখ আড়াল করে। নিশ্চুপ সন্ধ্যার মতো আবারও নিরুত্তর সে।

তিন.

শালুক কোত্থেকে যেন একটা ময়না নিয়ে এসেছে। বাঁ হাতের মুঠি তাই আড়াল করে ধরা। তাকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেলো অনেক কিছু। মল্লিকবাড়ির পাঁচিল টপকে বা প্রধান ফটক ধরে সে আগেও কয়েকবার এসেছে। এ বাড়ির গণ্ডি তার অচেনা নয়। আগে প্রতিবারই সে কিছু না কিছু কুড়িয়ে নিয়ে যেতো। আমের দিনে আম, কুলের সময়ে কুল, আতা, পেয়ারা এমন মিঠেকড়া মৌসুমী ফল। তাছাড়া বাড়ির সৌখিন বাগান থেকে ফুল চুরি করেও নিয়ে গেছে। দত্ত বাড়িতে ফরমাশ পেয়ে- কখনওবা পূজার কাজে। ভাঙা পাঁচিল ডিঙানো কিংবা উঠান মাড়িয়ে বারান্দায় প্রবেশ মোটেও নতুন নয় তার কাছে।

কিছুক্ষণ বাদে বুকে সাহস ফিরে আসে শালুকের। চোখ দুটো অন্ধকারেও চকচক।

মা বাড়ি নেই? মা কোথায়?

মা? কে মা? হৃৎপাখির ডাকে হঠাৎ চমকে ওঠেন মল্লিকবাড়ির কর্তা। চোখ দুটো অস্বাভাবিক কৌতূহলভরা- গোল গোল।

বা রে… এখানে যিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলতেন আমার সাথে। মাঝে মাঝে দুপুরে ভাতও মেখে খাওয়াতেন। তেল দিয়ে মাথার চুল আঁচড়ে সিঁথি কেটে দিতেন যত্ন করে। সে-ই মা নেই আজ?

রোমেন মল্লিক হাঁ করে চেয়ে থাকেন শালুকের দিকে। সন্ধ্যার এমন সময়ে একটি অপরিচিত কিশোরের কাছ থেকে তিনি যা শুনছেন তা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ছেলেটির মুখ থেকে তিনি তার সদ্যপ্রয়াত স্ত্রী সম্পর্কে যে অজানা বিষয়গুলো শুনছেন তা যেন অবিশ্বাস্য। নাহার ও শালুকের মধ্যকার এমন দুরন্ত সখ্য, ভাব-ভালোবাসার মধুর সম্পর্ক তার কাছে উন্মোচিত হলো এক অপার বিস্ময় নিয়ে।

বাইরের টুকিটাকি কাজ সেরে কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা লেগে যেতো রোমেন মল্লিকের। আর এদিকে শামসুন নাহার বাড়িতে একা একাই থাকতেন। সাংসারিক কাজ গোছানোর পর একটা সমস্ত দিন পড়ে থাকতো তার সামনে। এমন পূর্ণদৈর্ঘ্য দিনের মাত্র কয়েক প্রস্থজুড়ে শালুক ছিল তার আনন্দের সঙ্গী। সারাদিন গাছের এ-ডালে ও-কোটরে পাখির ছানা খুঁজে দিনের কোনো এক সময়ে চলে আসতো তার কাছে। এভাবেই হয়তো দুজনের এমন অন্তরঙ্গ সখ্য গড়ে উঠেছিল দিনের পর দিন।

সন্ধ্যার ফুরফুরে হাওয়া একখণ্ড বিষণ্ন কালো মেঘ নিয়ে এলো কোত্থেকে যেন! তাড়িয়ে আসা সে মেঘ ঠাঁই নেয় রোমেন মল্লিকের মনের কোণে। স্ত্রীর সঙ্গে এতদিনের গাঁটছড়া বেঁধে সংসার করা- অথচ তিনি যেন কত অজানা তার কাছে। খুব আফসোস হচ্ছে এই ভেবে যে, বাইরের জগতে মিছেমিছি অবিরাম ব্যস্ত ছিলেন তিনি। তাই নিজেও কতটা অমনোযোগী এবং খোঁজখবরবিহীন হয়ে পড়েছিলেন সংসারের দিকে- বিশেষত স্ত্রী নাহারের প্রতি। অথচ তার সে অনুপস্থিতি, ধারাবাহিক শূন্যতা পূরণ করে দিয়েছিল একটি অচেনা কিশোর। কী পরম মায়ায় এ বাড়ির নিঃসঙ্গ মানুষটির সাথে একটি অসম মায়ার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল ধীরে ধীরে। কতটা বেখেয়ালি হলে এমন হয় যে যার বিন্দুবিসর্গ তিনি আগে জানতে পারেননি। এদিকে শালুক এ বাড়ির সব পথ চেনে, উঠোন-বারান্দা-গলি সবকিছুই জানে।

তা তোর হাতে ময়না কেন? কোত্থেকে নিয়ে এলি এটা?

গাছের ডালে, কাণ্ডের খোঁড়লে পাখির বাসা হলেই আমি খোঁজ নিই। পাখির ছানা ফুটলে এ-বাসা ও-বাসা ঘুরে ওগুলোর যতœ করি। তারপর একটু বড় হলেই…

…এদিক-ওদিক চালান করে দিই। শালুকের মুখ থেকে ছোঁ মেরে কথা কেড়ে নেয় রোমেন মল্লিক। তুই তো তবে পাখির সব বাসা নষ্ট করছিস। ওদের সংসার ভেঙে কষ্ট দিচ্ছিস আর…

না না না, কথার মাঝখানে থামিয়ে দেয় শালুক। মল্লিক সাহেবও চুপ।

শেষবার যখন মায়ের কাছে এসেছিলাম, মা আমাকে আদর করে কত কী খাইয়েছিলেন। মুরগির মাংস দিয়ে ডাল-ভাত আর দুটো কাঁচা লঙ্কা। খাওয়াশেষে এক বাটি নলেন গুড়ের পায়েস। আহ, স্বাদ যেন এখনও মুখে লেগে আছে। আর কয়েকটা টাকাও গুঁজে দিয়েছিলেন পকেটে- বাঁশি কিনব বলে। ‘গাছের কোটর থেকে একটা ময়না আনিস তো খুঁজে’, তিনিই তো একদিন বলেছিলেন।

এবার বুঝলাম সব। তবে ঘরে বসে যা।

না, ঘরে যাব না। এ বারান্দাটাই আমার ঘর। এখানে মায়ের সাথে কাটাতাম। অনেকদিন আসতে পারিনি। মাকে অনেকদিন দেখিনি। একবার ডাকুন- সেই কতদূর থেকে এসেছি।

তোর মাকে দেখার জন্যেই তো ভেতরে ডাকছি। ভেতরে আয় একবার।

না কর্তামশায়, ভেতরে যাব না। আপনি ডাকুন।

শালুকের মুখ থেকে সব কথা শুনে রোমেন মল্লিক চুপ করে থাকে। ওর হতবুদ্ধিতা দেখে শালুকের মুখে আবার কথার খই ফোটে।

‘বুঝলি শালুক। তুই তো সারাদিন বন-বাদাড়, গাছে-মাঠে ঘুরে বেড়াস। আমায় একটা কথা-বলা ময়না এনে দিবি? পুষব। সারাদিন একা সময় কাটে না। শরীরটাও ভালো লাগছে না আজকাল। ওটার সাথে কথা বলে খানিকটা সময় কাটাতে পারতাম। শান্তিও পেতাম হয়তো।’ মা একদিন এমন সুরে বলেছিলেন আমাকে। মার জন্য আমি সব করতে পারি।

রোমেন মল্লিকের চোখে-মুখে একটা গ্লানিময় ছায়া অন্ধকার করে এলো। ভারি কণ্ঠে বললেন, এটা বুঝি সেই ময়না?

হ্যাঁ। আমি একে দু মাস ধরে কথা শিখিয়েছি।

সে এখন কথা বলতে পারে?

পারে তো!

হাতের মুঠো থেকে ময়নাটা স্পষ্ট করে তখনই চেঁচিয়ে উঠল, শালুক… শালুক…। যেন সে শুধু কথাই বলতে পারে না, মানুষের সব কথা বোঝেও।

আমি তো এমন কথা-বলা ময়না দেখিনি কোনোদিন। তোর মাও তো কোনোদিন তোর কথা বলেনি আমাকে।

একটু আক্ষেপ, চাপা অভিমান আর হালকা গ্লানিবোধ থেকেই কথাটা বললেন রোমেন মল্লিক।

আমি তো তাই নিয়ে এলাম হয়রান হয়ে খুঁজে খুঁজে। সেই কতদূর এর ঘর। তবু একটু একটু করে পোষ মানিয়েছি মানুষের মতো। মাকে একদম চমকে দেব বলে। আচ্ছা, মা কোথায়?

রোমেন মল্লিক বারান্দা ছেড়ে এবার ঘরমুখো ধীর পায়ে এগোতে থাকেন। শালুকের হাতের ময়না মিষ্টি কণ্ঠে ডাকতেই থাকে শালুক… শালুক…।

চার.

মল্লিকবাড়ির চারপাশজুড়ে ঘোর সন্ধ্যা নেমে গেছে ততক্ষণে। চিরিৎ চিরিৎ ঝিঁঝিঁর ডাকসহ আরও অজানা অচেনা শব্দ সম্মিলিত কোরাস তুলে যাচ্ছে বুনো ঝোপঝাড়ে। বাইরের হালকা বাতাসের দপদপানি বাগানের গণ্ডি ছাড়িয়ে বারান্দায় এসেও হানা দিয়ে যাচ্ছে। নদীর দিকে মাঠের কাছে দু একটি আলো জ¦লছে। মানুষের দু একটি কথাও ফুটছে জোনাকির মতো। মল্লিকবাড়ির স্যাঁতসেঁতে উঠানে পুরানো সন্ধ্যা তার ইচ্ছামতো নিজেকে সাজিয়ে-গুছিয়ে আনছিল প্রতিদিনের মতো। ঘরের ভেতরে তখনও আলো জ্বালানো হয়নি।

রোমেন মল্লিক ঘরে ঢুকে জেঁকে বসা অন্ধকারকে তরল করতে আলো জ্বেলে দেন। তার পেছনে গুটি-গুটি পায়ে জমানো সঙ্কোচ নিয়ে পাখি হাতে শালুক। তিনি শ্যামল মুখের বুনো ছেলেটিকে নাহারের সযতে্ন সাজানো অবস্থায় কল্পনা করতে চাইলেন। চোখের সামনে দেখতে পেলেন, দারুণ পরিপাটি এক মায়াভরা মুখ কেমন কালো ময়না হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের প্রতি, মানুষের প্রতি এমন গভীর মমতা তিনি অনেকদিন দেখেননি।

ও যে নাহারের পরম আদরের শালুক। শালুক ততক্ষণে বিশাল ছবিখানার সামনে। মাসখানেক আগেই রোমেন মল্লিক যত্ন করে বাঁধিয়ে দেয়ালে টানিয়েছিলেন স্ত্রীর ছবিটা। সেদিকে তাকিয়ে থাকে শালুকের মায়াভরা দুটো টলটলে চোখ- যেন রাজ্যের জমানো কথার, কুড়ানো গল্পের টলটলে এক দীঘি।

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More