করোনায় মনুষ্যত্বের মৃত্যু ঠেকানো দরকার
যে কারও সাহায্যে আমরা এগিয়ে যাব, মমতা দেব, সেবা দেব, করোনাকালে এটিই হোক আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি
৩২৮

মৃতদেহ পড়ে থাকছে রাস্তায়।  কেউ ধরছে না, স্পর্শ করছে না।  হচ্ছে না শেষবারের মতো সম্মানের সঙ্গে সৎকারের ব্যবস্থা।  পাশের ঘরে আপনজনের লাশ একা ফেলে রেখে স্বজনেরা আলাদা থাকছে অন্য ঘরে।  হয়তো বা কাঁদতেও ভুলে যাবে! জানাজায় পরিবারের চার সদস্য ছাড়া অংশ নিচ্ছে না গ্রাম বা মহল্লার কেউ।  জানাজা পড়ানোর জন্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোনো ধর্মপ্রাণ মানুষকে।
চিকিৎসার আশায় সরকারী বেসরকারী ক্লিনিক হাসপাতালগুলোয় ঘুরছে মানুষ।  জঙ্গলে ফেলে যাওয়া হচ্ছে বৃদ্ধা মাকে।  রোগীকে মমতা দেয়ার পরিবর্তে পিটিয়ে এলাকা ছাড়া করার চেষ্টা করা হচ্ছে।  চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মীদের হুমকি দেয়া হচ্ছে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্য।  মানুষ এড়িয়ে যাচ্ছে মানুষকে, অসুস্থ হলে দায়ভার নিতে চাইছে না কোনো। এ যেন কেবল স্বার্থান্ধ অমানুষের মতো নিজেকে বাঁচানোরই পালা!
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য- এই চিত্র এখন আমাদেরই দেশে দেখতে হচ্ছে।  আসলে এই সময়ে করোনাভাইরাস যতটা না মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, তার চেয়ে বেশি করোনা আতঙ্কে মনুষ্যত্ব হারাচ্ছে মানুষ।  সাধারণ মৃত্যুর চেয়েও মনুষ্যত্বের এই মৃত্যু নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।  আর এর প্রধান কারণ অহেতুক আতঙ্ক।  সাধারণ চিন্তা-ভাবনাও যেন লোপ পেয়েছে অতি আতঙ্ক প্রচারে।  মানুষ ভুলতে বসেছে তার ভেতরের মানবিতার কথা। আতঙ্কে নিজের ভেতরেই প্রতিনিয়ত মরছে মানুষ। মরছে মনুষ্যত্ব।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত এমন মনুষ্যত্বহীনতার নজির আগে কখনও ছিল না আমাদের সংস্কৃতিতে।  কেউ একটা হাঁচি দিলে, কেউ একটা কাশি দিলেই ভীতসন্ত্রস্ত এবং অসহিষ্ণু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছি আমরা।  অনেকেই এখন ভয়ে আতঙ্কে কাশি দিতেও ভুলে গেছি।  মনের বাঘে খেয়েছে বলে যে কোনো মৃত্যুকেই আমরা ‘করোনা’ বলে সন্দেহ করছি।
নারায়ণগঞ্জে একজন রোগীকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়েছে।  কাশি দিয়েছে।  করোনা সন্দেহে তাকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে রাস্তায় নামিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তার পরিবার অনেককে ডেকেও কোনো সাড়া পায়নি।  কোনো প্রতিবেশী এগিয়ে আসেননি। পরে রাস্তায় পড়ে থেকে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন মানুষটি। ফেনীতে নিজ বাড়িতে যাওয়ার পরে জ্বরে ভুগে মারা যান একজন।  করোনা সন্দেহে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তার পরিবার একঘরে হয়ে যায় এবং তার জানাজায় পরিবারের চার সদস্য ছাড়া কেউই অংশ নেননি।  অথচ পরে জানা গেল যে, তিনি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন না। সুনামগঞ্জের এক মসজিদ থেকে লাশ বহনের খাটিয়া দেয়া হয়নি।  কাঁধে নিয়ে এক তরুণকে দাফন করতে নিয়ে যায় দুই ভাই ও বাবা।  শরীয়তপুরে সদর হাসপাতালে মারা যাওয়া সন্তানের লাশের পাশে আহাজারি করছেন মা।  স্বজন বা গ্রামবাসী কেউ লাশ দেখতে আসেনি। মৃতের বড় ভাই, চার বোন, বোনের পরিবারের সদস্যরাও ফিরে তাকাননি। ২১ ঘণ্টা সেইভাবেই পড়েছিল লাশ।  অথচ সেই যুবকের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে তারও করোনা ছিল না।  মুজিব নগরে করোনা রোগি সন্দেহে মৃত এক ব্যক্তির জানাজা পড়ানোর জন্য ইসলামী ফাউন্ডেশনের নির্ধারিত পাচঁ জন ঈমামের একজনও আসেননি, ইউএনও এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ কয়েকজন মিলে কোন রকমে দাফন করা হল মৃতকে।
শুধু আক্রান্ত মানুষ বা মৃত মানুষকেই নয়, তার পরিবারকে আমরা একঘরে করে ফেলছি।  যে চিকিৎসকরা, যে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজের জীবন বিপন্ন করে অসুস্থদের সেবা দিচ্ছেন- আমাদের সমাজের আতঙ্কিত দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য মানুষ তাদেরও রীতিমতো অচ্ছুতের দৃষ্টিতে দেখছি।  বিপজ্জনক মানুষ হিসেবে অসহিষ্ণু আচরণ করছি, পিটিয়ে এলাকাছাড়া করতে চাচ্ছি।  এভাবেই ভুল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মেরে ফেলছি নিজেদের মনুষ্যত্বকে।  অথচ এমন সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের মনুষ্যত্বের জাগরণ।  আমাদের জাতির গর্বের সম্পদ ‘মনুষ্যত্ব’কে, ‘মানবিকতা’কে আর মরতে দেয়া যাবে না।  মনুষ্যত্বের মৃত্যু ঠেকানো দরকার আগে।  তাহলেই কমানো যাবে মানুষের মৃত্যু।  করোনা মোকাবেলা সহজ হবে। দ্রুত হবে।  আমরা বিশ্বাস করি, বাঙালির এই মনুষ্যত্ব হারানোটা একেবারেই সাময়িক।  নিশ্চয়ই নিজেদের মানবিকতার জাগরণ ঘটবে।  মানুষের পাশে দাঁড়াবে মানুষ।
এটি তো আমাদের দেশের বৈশিষ্ট্য নয়।  ১৯৭১ সালে আমাদের কিছুই ছিল না, শুধু মনোবল আর মনুষ্যত্ব ছাড়া।  এক বাঙালি অন্য বাঙালির জন্য যে দরদ দেখিয়েছেন, যে মমতা দেখিয়েছেন তার উদাহরণ এখনও অনুপ্রেরণা জোগায়।  বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে ইতিহাস আমরা রচনা করেছিলাম, সেই বাঙালিই তো আমরা।  আর এখন একজন মানুষ অসুস্থ থাকবে অথচ তার চিকিৎসা হবে না?  তাকে এড়িয়ে যাবে মানুষ ! স্বার্থপরতায় নিমগ্ন হয়ে নিজেকে বাঁচাতে মৃত মানুষকে সম্মানের সঙ্গে শেষ বিদায় জানাবে না?  এর চেয়ে বেদনার বিষয় আর কী হতে পারে!
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী, তা খুব সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে মনুষ্যত্বকেই জাগাতে হবে আগে।  আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে- আমরা মানুষ, সৃষ্টির সেরা জীব; আশরাফুল মাখলুকাত।  যদি আমাদের মনুষ্যত্বই হারিয়ে যায় তাহলে মানুষ আর বন্যপ্রাণীর মধ্যে আর কোনো পার্থক্য থাকে না।  মনুষ্যত্বই আমাদের মানুষ করেছে।
মানুষের প্রতি মমত্বকে যত প্রবলভাবে জাগিয়ে তোলা যাবে, ততই বেঁচে থাকবে মানুষ।  কোনো করোনা রোগীকে অপরাধী বা অচ্ছুৎ ভাবা যাবে না।  তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার বা অন্যায় আচরণ করা যাবে না।  বরং যারই সাহায্য প্রয়োজন তাকে সাহায্য করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।  প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে কারও সাহায্যে আমরা এগিয়ে যাব, মমতা দেব, সেবা দেব।  করোনাকালে এটিই হোক আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। -সম্পাদকীয়

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More