একটা আত্মিক প্রেমের গল্প-বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না
৫৩৮

ড. আখতারুজ্জামান

প্রিয়ন্তী আমার ভাল বন্ধু। কলেজে ইন্টার পড়াকালীন দুজন একসাথে পড়ালেখা করেছি। অন্য জেলার বাসিন্দা হওয়া সত্বেও বাবার চাকুরি সূত্রেই একটা সময় দুজনে একই বিদ্যাপীঠের সতীর্থ ছিলাম। কলেজে পড়তাম, এক ক্লাসে, একসাথে, তবে ভিন্ন সেকশনে। ফলে দেখা সাক্ষাতের সুযোগ কম ছিল। তদুপরি আমরা মফঃস্বল জেলা শহরের এমন একটা কলেজে পড়তাম যেখানে কলেজ করিডোরে ইন্টার পড়া ছেলেমেয়েদের পরস্পরের সাথে কথা বলার বিষয়টি কলেজ কর্তৃপক্ষের নজরে আসলে কলেজ থেকে রাসটিকেট হওয়ার ভয়ে সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হতো। ফলে সতীর্থ মেয়ে বন্ধুদের সাথে ঘনিষ্ট হওয়া তো পড়ে মরুক কথা বলাই দুরহ ছিল।
এমন সব কড়া অনুশাসনের মধ্যে যারা শহরে বাস করতো, ওদের মধ্যে অবস্থানগত কারণে ছেলে মেয়েতে কিছুটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠলেও আমরা যারা গ্রাম থেকে কলেজে আসতাম, তাদের সে সুযোগটা একেবারেই ছিল না।

প্রিয়ন্তীর সাথে আলাপের বিষয়টি অনেকটা নাটকীয়। আমি থাকতাম ওদের বাসা থেকে এক কিলোমিটার দুরবর্তী শহরতলীর একটি গ্রামে। কখনো বাইসাইকেলে চেপে আবার কখনো পায়ে হেঁটে কলেজে আসতাম। প্রিয়ন্তীও বেশিরভাগ সময় পায়ে হেঁটেই কলেজে আসতো, কারণ তখন ছোট্ট জেলা শহরে এত বেশি রিক্সার প্রচলন ছিল না; আর অটোবাইক, স্কুটার জাতীয় যানবাহন তখনও পথে নামেনি।

কলেজে আসা যাওয়ার পথে কখনো তার সাথে রাস্তায় কৌতূহলী চোখাচোখির মাধ্যমে একে অন্যকে ক্রস করতাম। প্রিয়ন্তী খুব ধীর গতিতে হাঁটতো ফলে আমি ওর কিছুটা পেছনে থাকলেও একটা সময় ওকে ক্রস করে সামনে চলে যেতাম। দুজন দুজনকে চিনতাম যে, আমরা একই গুরুর শীর্ষ কিন্তু কথা বলার সাহস ছিল না।

আস্তে আস্তে কলেজ ক্যাম্পাসে নতুন ছাত্রত্বের সৌরভ শরীর মন থেকে খানিকটা চলে গেছে, কিন্তু বয়সগত কারণে মনের মধ্যে তখনও রয়েছে বাসন্তী আমেজ। 
ফার্স্ট ইয়ার
ডোন্ট কেয়ার! 
তাই পড়াশোনার তেমন কোন চাপ নেই।

যতটা মনে পড়ে সময়টা ছিল মার্চ মাস। শীতের ম্রিয়মনতা কাটিয়ে জুবুথুবু প্রকৃতি সবে সতেজ হতে শুরু করেছে। পত্র পল্লবে নতুনের আগমনী ধ্বনির আনাগোনা শুরু হয়েছে।
পদব্রজে মহা বিদ্যাপীঠে যাচ্ছি, কলেজে পৌঁছুতে তখনো এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। আকস্মিক লক্ষ্য করলাম, মেরুণ রংয়ের কামিজ আর সবুজ রংয়ের সালোয়ার পরিহিতা প্রিয়ন্তী আনমনে একাকী ধীর গতিতে হেঁটে হেঁটে কলেজে যাচ্ছে। মনে মনে সাহস সঞ্চয় করলাম আজকে ওর সাথে কথা বলতেই হবে। দ্রুত হেঁটে ওকে ক্রস করতেই আচমকা জিজ্ঞেস করে বসলাম, 
“আপনি কি ইন্টার বি সেকশনে পড়েন?” 
এরপর কিছু ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, বিগত এসএসসি’র রেজাল্ট ইত্যাদি।

প্রথম দিনের আলাপে শ্যামাঙ্গী রংয়ের দীর্ঘদেহী প্রিয়ন্তি সম্পর্কে যা জানলাম:
বাবা পদস্থ চাকুরে। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সে সবার বড়। এসএসসিতে শহরের প্রতিষ্ঠিত বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে পাশ করেছে। এমন সব প্রাথমিক তথ্যের আদান প্রদান হলো মাত্র।
প্রথম দিনের পরিচয়ে এটাও জানা গেল প্রিয়ন্তি প্রাইভেট পড়তো আমাদের স্কুলের একজন বিজ্ঞান শিক্ষকের কাছে। আমাদের আলাপচারিতায় প্রিয়ন্তী এটা নিশ্চিত হলো যে, আমাদের ঐ শিক্ষক নাকি আমার বিজ্ঞানমনস্ক জ্ঞানের তারিফ করে তাদের কাছে মাঝেমধ্যে বক্তব্য দিতেন।
নিজের মেধার স্বীকৃতি শুনে প্রিয়ন্তি বোধকরি আমার প্রতি একটু দুর্বল হলো এই ভেবে যে, আমি ছাত্রত্বের ক্যাটাগরিতে অন্তত: তার থেকে খানিকটা হলেও উপরে। এমনটি শুনে আমিও একটু গর্বিত হলাম বটে!

এরপর থেকে মাঝে মাঝে কলেজ আসা যাওয়ার পথে আমাদের মধ্যে একটুখানি কাথাবার্তা চলতো। কখনো দু একখানা নোটের আদান প্রদানও হয়ে থাকতে পারে। তবে সম্পর্কটা কখনো “আপনি” থেকে নিচে অগ্রসরমান হওয়ার সাহস পায়নি। প্রসঙ্গত বলে রাখি সে সময় আমরা যারা কলেজে সহপাঠি ছিলাম, তাদের অনেকের সাথেই এমন “আপনি আপনি” সম্পর্ক ছিল, কারণ তখন আমরা হাল আমলের মত অতটা স্মার্ট হয়ে উঠতে পারিনি।

ইন্টার কলেজ লাইফের দুই বছরের মধ্যে ছুটিছাঁটা বাদ দিলে গড়ে এক বছরের বেশি এ্যাক্টিভ ক্লাস হয় না। ফলে ইন্টার পরিক্ষার আগে ওর সাথে আমার সাকূল্যে কথা হয়েছে ১০/১২ দিনের বেশি নয়। এই ১০/১২ দিনের সম্পর্কেই কেমন যেন পরস্পরের মধ্যে অজানা ভাল লাগার একটা আকর্ষণ তৈরি হয়ে যায়, তবে সেটাকে কোনভাবেই মনোগত প্রেম বলা যাবে না; বরং এটাকে একটা আত্মিক প্রেম বা নিবিড় বন্ধুত্ব বলা যেতে পারে। তদুপরি নিজেদের মধ্যে ধর্মগত বৈষম্যের বিষয়টিও প্রেমজ চিন্তা করবার ক্ষেত্রে একটা বড় অন্তরায় ছিল। বড্ড ধর্মীয় গোঁড়ামির মধ্যেই ওদের নিত্যদিনের বেড়ে ওঠা বলে জেনেছি।

এই আত্মিক বন্ধুত্বের প্রাথমিক ইতি ঘটে ইন্টারের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের দিনে। প্রিয়ন্তির ইচ্ছে ছিল মেডিক্যালে পড়বে, বড় ডাক্তার হবে, কিন্তু রেজাল্টের দিনে ওদের বাসার পাশ দিয়ে যাবার সময় লক্ষ্য করলাম, ওর দুই ভাই বাসার সামনের মাঠে ক্রিকেট খেলছে। বাই সাইকেল থামিয়ে ওর ভাইকে বললাম, 
“খোকন, তোমার আপুর রেজাল্ট কি?
“রেজাল্ট পাইনি”, 
এমনটি বললো খোকন।
তাৎক্ষণিক আমার কন্ঠস্বর শুনে ঘরের বাইরে একসাথে বেরিয়ে আসলো প্রিয়ন্তী ও ওর মা।
কোনকিছু চিন্তা না করেই ওর মা আমার ফার্স্ট ডিভিশনে ইন্টার পাশের রেজাল্ট শুনে বাসার ভেতরে ডেকে বসিয়ে নানান কথাচ্ছলে যা বুঝলাম তাতে প্রিয়ন্তি পাশ করতে পারিনি।
ওদের ভীষণ মন খারাপ!
ওদের সাথে মনটা আমারও খারাপ হলো। সেইসাথে কেমন যেন একটা মায়া জন্মালো ওর এমন অপ্রত্যাশিত খারাপ রেজাল্টের জন্যে।
ওর মাকে কলেজে যাওয়া আসার পথে দৈবাৎ বাড়ির সামনে দেখা হলেও তাঁকে গুরুগম্ভীর আর রাশভারি মহিলা বলে মনে হলেও এদিন তাঁর আন্তরিক ব্যবহারে মুগ্ধ হলাম।
প্রিয়ন্তী দেখতে তেমন সুন্দরী না হলেও নম্র ভদ্র বিনয়ের এতটুকু কমতি ছিল না ওর মধ্য। সাংস্কৃতিমনা ও ভাল সংগীত শিল্প প্রিয়ন্তীর রেজাল্ট এতটা খারাপ হবে ভাবিনি, কখনো।
ওদের বাসা থেকে বেরুবার সময় আমার তরে ওর একটা সকরুণ আর্জি ছিল, আমি যেন আমার নোটগুলো ওকে দিই, কারণ তাকে পুনর্বার ইন্টার পরিক্ষা দিতে হবে। তবে আমার জীবনে সে সুযোগ আর কখনো হয়নি।
এরপর বিচ্ছেদ!!! 
বিনে সূতোর বন্ধনে ভারি টান পড়ে।
প্রিয়ন্তীর সাথে আমার প্রেমাপাখ্যানের একাঙ্কের এখানেই যবনিকাপাত ঘটে।

দেশের নামী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ভর্তি ও পাঠভ্যাস শুরু হলেও প্রিয়ন্তীর প্রতি আমার প্রেমটাও কোথায় যেন হারিয়ে গেল। বেশ ছিলাম, তবুও একাকী নিরালায় বসে অতীত স্মৃতিচারণ করতে বসে কেমন যেন একটা অন্যরকমের বন্ধুত্ব ও ভালবাসায় প্রিয়ন্তীর কথা অবচেতনভাবেই একটু আধটু মনে পড়তো। 
প্রিয়ন্তিকে নিয়ে নয়, তবে ওর মত মার্জিত একটা মেয়ের সাথে যদি আমার মত গণ্ডমূর্খের প্রেম ভালবাসা বা স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাহলে মন্দ কী? 
প্রসঙ্গত বলে রাখি পরবর্তীকালে যার সাথে আমি তিন দশক ধরে ঘরকন্যা পেতে বসেছি, তার সাথে কিন্তু বাস্তব ও কল্পনিক প্রিয়ন্তীর সত্যি সত্যিই অনেক মিল আছে। সেদিক দিয়ে আমি ভাগ্যবানই বলতে হয়।
সৃষ্টিকর্তা আমার আহবান শুনেছেন।
প্রিয়ন্তীকে নিয়ে, এমনসব চটুল আর হালকা ভাবনার ভবতরীতে যখন আসীন, এরই মধ্যে কেটে গেছে আরো তিনটে বছর। ততদিনে গেঁয়োভূত এই ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাওয়া বাতাস খেয়ে কিঞ্চিৎ চৌকস হয়েছে।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির অবকাশে পুরনো কলেজ ক্যাম্পাসে গেলাম ইন্টারের মূল সনদপত্র আনতে। কলেজ প্রাঙ্গণের প্রশাসনিক দপ্তরে সামনের বারান্দায় হঠাৎই প্রিয়ন্তীর সাথে দেখা।বইখাতা হাতে। তিন বছরে চেহারার কোন পরিবর্তন হয়নি। কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে কিছু কুশল বিনিময়ের শেষে যা জানলাম ইন্টার পাশের পরে মেডিক্যালে চাঞ্চ না পাওয়ায় অভিভাবকের কড়া অনুশাসনের কারণে সরকারি কলেজে পাস কোর্সে বিএসসি ভর্তি হয়েছে।
মিনিট ১০/১৫ কথা হলো। আন্তরিকতার এতটুকু অভাব ছিল না, তবে স্মার্ট ছেলেটি এবার সলজ্জ ভঙ্গিতে সোজাসাপ্টা বলে ফেললো, “প্রিয়ন্তী কেমন আছো?” 
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে মনে হয়েছে প্রিয় বন্ধুদের সাথে “আপনি” বলাটা কোন ভাল বন্ধুত্বের লক্ষণ নয়।
আমি তাকে তুমি করে বললেও প্রিয়ন্তি কিন্তু সেদিন আমাকে “আপনি” “তুমি” কোনপ্রকার সম্বোধন করেনি। বরং পরোক্ষ আলাপচারিতায় শেষ হলো সেদিনের সেই অত্যাল্প সময়ের কিঞ্চিত কথোপকথন। 
আমার জীবনে প্রিয়ন্তীকে নিয়ে কলেজ ক্যম্পাসের সেই করিডোরই সেদিন তৈরি হলো স্মৃতিময় আরেক উপাখ্যান, যে স্মৃতি আজও আমাকে নাড়া দেয়, হৃদয় মনকে উদ্দীপ্ত করে। প্রিয়ন্তীর স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে ক’দিন আগে সেই কলেজ করিডোরের ঠিক সেই জায়গায় একটা ফটোগ্রাফিক শর্ট নিয়ে এসেছি, যেখানে দাঁড়িয়ে বহুবছর আগে প্রিয়ন্তী স্বশরীরে দেখেছিলাম। 
ভারি পাগলামি!!

প্রিয়ন্তী উপাখ্যানের এই ইপিসোড আপাতত: ওখানেই সমাপ্ত হলো।
পরে জেনেছি, বিএসসি পাশের পরে জনৈক ভাল পাত্রের পাণি গ্রহণ শেষে তাঁর বদৌলতে প্রাচ্য প্রতীচ্য ঘুরে শেষতক প্রাচ্যের এক দেশে স্থায়ীভাবে থিতু হয়ে বসে আপাদমস্তক সংসারী হয়ে স্বামী সন্তান নিয়ে বেশ আছে।

শেষবার প্রিয়ন্তীর সাথে দেখা হওয়ার প্রায় তিন দশক পরে অকস্মাৎ জানলাম আমার জনৈক ঘনিষ্ট বন্ধু, বৈবাহিক সূত্রে প্রিয়ন্তীর দূর সম্পর্কের জামাই বনে গেছে। এবারে জামাই বন্ধুটির কাছ থেকে প্রিয়ন্তীর প্রাচ্যের একটা মুঠোফোনের নম্বর পেলাম। একদিন কল দিলাম, ৫/৭ মিনিট সাবলীল কথা হলো, একেবারে খাঁটি বন্ধুর মত, সেই পুরাণা স্মৃতিচারণ হলো। এবারে আর “আপনি” “তুমি”র জড়তা ছিল না, সাবলীল “তুমি”তেই কথা চললো। বেশ লাগলো।

এমন ঘটনার দিন পনের পরে হঠাৎ সেই মুঠোফোন থেকে আমার মুঠোফোনে একটা কল আসলো। আমি তখন আমার বসে্র রুমে বসা। রুম থেকে দ্রুত বাইরে চলে আসলাম। ফোনটা পেয়ে মনটা খুশিতে গদগদ হওয়ার পরিবর্তে নিমিষেই বিষাদে ভরে গেল। 
ওপাশে থেকে দরাজ গলায় একজন ভদ্রলোক আইনজীবীর মত জেরা করে জানতে চাইলেন আমার সাথে প্রিয়ন্তীর কী সম্পর্ক? কেন তাকে আমি এতটা বছর বাদে সেদিন ফোন করেছিলাম ইত্যাদি।
বুঝতে বাকি রইলো না, ভদ্রতার মুখাবরণে ফোন করা ভদ্রলোকটি প্রিয়ন্তীর সন্দেহপ্রবণ পতিপ্রবর । মনটা খারাপ হলো এই ভেবে যে, আপাদমস্তক আমার ভাল একজন বান্ধবীকে নিয়ে অহেতুক ঐ মানুষটির সন্দেহবাতিকতা দেখে। বাংলা ইংরেজী মিশিয়ে দুটো বেশি কথা শুনিয়ে মনের জ্বালাটা জুড়ালাম বটে, তবে মনে মনে এই ভেবে কষ্ট পেলাম যে, এমন একটা মানুষকে স্বামী দেবতা জ্ঞান করেই গোটা জীবন কাটিয়ে দিতে হচ্ছে আমার সহজ অন্ত:প্রাণ একজন বান্ধবীকে। 
সব মিলিয়ে এরই মধ্যে সময় কেটে গেছে অর্ধ শতাব্দীর কাছাকাছি।

মাঝে আরেক বন্ধুর মাধ্যমে প্রিয়ন্তীর নিজস্ব একটা সেল নম্বর ও ভাইবার নম্বর পেয়েছিলাম বটে, কিন্তু কল করবার সাহস হয়নি। কারণ চুন খেয়ে গাল পুড়ে যাবার কারণে দই খেতে ভয় হতো।
তবে মনে মনে নিজের কাছে খুবই কৌতূহলী জিজ্ঞাসা?
প্রিয়ন্তী এখন দেখতে ক্যামন হয়েছে, ওর ছেলে মেয়েরা কে কোথায় কি করছে, নাতি পোতা আছে কিনা? ওর বাবা মা বেঁচে আছেন কিনা? ভাই দুটো কোথায় কি করে? ও কি এখনো ওর সেই টিপক্যাল পছন্দের মেরুণ রংয়ের পোশাক পরে কিনা? ইত্যাকার যাবতীয় কৌতূহলী স্বগতোক্তি মন মাঝে ভর করবার কারণে সোশ্যাল মিডিয়ায় তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তার কোন সন্ধান মেলেনি। কারণ সে আন্তর্জালের জগতে সরব নয়, বুঝতে পারি।

বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত ক’দিন আগে অনলাইন মিডিয়ায় আরেক বন্ধু থেকে ওর কয়েকখান পারিবারিক ছবি পেলাম। মুহুর্তের মধ্যে মনের ফ্ল্যাশব্যাক আমাকে নিয়ে গেল প্রায় চার দশক আগে ওর সাথে আলাপের প্রথম দিনটিতে। ওর সাথে প্রথম আলাপের দিনে মনে ছিল বাসন্তী আমেজ; আর এতটা বছর পরে ছবিটা যখন পেলাম সে সময়ও প্রকৃতিতে ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী আমেজ চলছে। যদিও প্রিয়ন্তী অভিধা সম্বলিত দু’টি বসন্তের মাঝে কেটে গেছে চার দশকের প্রলম্বিত সময়।৩৭ বছর আগে ওকে সশরীরে দেখেছিলাম, আর সবে দেখলাম ছবিতে। সেই শারীরিক গড়ন, নাক, মুখের গঠনে ভারি মিল পেলাম, যদিও শারীরবৃত্তীয় প্রতিফলনে খানিকটা পরিবর্তন এসেছে। মনে হলো বয়সের ভার এখনো সেভাবে ওর শরীরে ভর করতে পারিনি, বরং আমরাই কিছুটা বয়সের কারণে ঝিমিয়ে পড়েছি।
ক্ষণিকের সেই স্মৃতির ফ্ল্যাশব্যাক যেন শেষ হতে চায় না!!
না, কক্ষণো নয়, প্রিয়ন্তীর সাথে আমার মনোগত প্রেমের ছিটেফোঁটা কোন সম্পর্ক কখনো ছিল না, এখনো নেই, তবুও ওকে আমার কেন এত ভাল লাগে, তার উত্তর আমার জানা নেই। প্রিয়ন্তীকে কেন এতটা ভাল লাগে তার উত্তরের খানিকটার আন্ত্যমিল পাওয়া যায় ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক জনপ্রিয় চলচিত্র “আবার তোরা মানুষ হ” চলচিত্রে প্রয়াত অভিনেতা সরকার ফিরোজের বিপরিতে জনপ্রিয় অভিনেত্রী ববিতার লিপ সিং করা গানেরর মাঝে।
অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী মনোভঙ্গিতে ঐ চলচিত্রে ববিতা গেয়ে চলেছেন:
“তুমি চেয়েছিলে ওগো জানতে কেন এত ভাল লাগে তোমাকে।
আমি বহুবার ভেবে দেখেছি
তার উত্তর কিছু জানি না।”

আমিও ঠিক তেমনিই, ভেবে পাইনে কেন প্রিয়ন্তীকে আজও এতটাই ভাল লাগে?

আমি ইচ্ছে করলে এখন ওর সাথে কথা বলতে পারি, যোগাযোগ করতে পারি কিন্তু কথা বলি না বা বলবোও না, পাছে আবার যদি ওর সেই আগের মত পারিবারিক সংকট তৈরি হয়। বরং সে ভাল আছে ভাল থাকুক। তবে এখনো চোখ বন্ধ করে তাকালে একে একে ওর চেহারা, ওর মা ভাইদের চেহারা, যে বাসায় থাকতো সেটার গেটআপ এক নিমিষে নির্ভুলভাবে মনে করতে পারি।এ যেন মনোরহস্যের এক জটিল বাতিঘরের আশ্চর্য প্রদীপের আলোকবর্তিকার মতই দীপ্যমান।

আমি বেশ করে জানি, 
আমি ওকে নিয়ে এতো কিছু ভাবলেও প্রিয়ন্তির মনে আমার জন্যে আজ আর ভাবনার এতটুকুও স্থান নেই। তবে দৈবাৎ কখনো যদি কোনভাবে আমার এই লেখাটা তার নজরে আসে এবং তখন ওর মনোবস্থা স্থিত থাকে তাহলে হয়তবা আমার এই লেখা একটু হলেও তার হৃদমাঝারে নাড়া দিতে পারে। একেই বোধহয় বলে
একপক্ষীয় ভাল লাগা বা ভালবাসা।

আমি নিশ্চিত এ জীবনে আর কোনদিন আমার প্রিয় বান্ধবী প্রিয়ন্তীর সাথে দেখা হবে না; তবুও সে আমার প্রিয় বান্ধবী, অন্যরকম ভাল লাগা ও ভালবাসার একজন মানুষ। আমার হৃদয়ে যার ভালবাসার একটা শ্রদ্ধার আসন আছে, নষ্টামী বা নোংরামির কোন অবকাশ নেই।
পাঠক বন্ধু, আপনারা জানেন কি? এমন আত্মিক ভালবাসাকে কি নামে অভিহিত করা যায়?

অনেক ভেবে চিন্তে মনে হলো প্রিয়ন্তীর প্রতি আমার ভালবাসাকে বোধকরি ওপার বাংলার নামজাদা সংগীত বোদ্ধা হেমন্ত মুখার্জী তাঁর সুললিত আবেগীয় কন্ঠে ঠিকঠাক মত প্রকাশ করে গিয়েছেন:
“মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে গেছে
যার চোখ তাকে আর মনে পড়ে না।
চেয়ে চেয়ে কত রাত দিন কেটে গেছে
আর কোন চোখ তবু মনে ধরে না।
হৃদয়ের শাখা ধরে নাড়া দিয়ে গেছে ………..।

সত্যিই তো প্রিয়ন্তীর সাথে আমার কোন হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক কোনকালে ছিল না, এখনো নেই, তবুও সে আমার মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে চলে যাবার প্রাক্কালে হৃদয়ের শাখা ধরেও খানিকটা নাড়া দিয়ে গেছে। 
এখানেই বোধহয় প্রিয়ন্তীদের মত কন্যা জায়া জননীদের সার্থকতা। আর এ কারণেই বড় আক্ষেপের সুরে কিম্বদন্তী খাঁটি বাঙালী কথাশিল্পী শরৎবাবু তাঁর শ্রীকান্ত উপন্যাসের শেষাংশে তাঁর প্রেয়সী পিয়ারী বাইজিকে উদ্দেশ্য করে বলে গিয়েছেন,
“…….নিঃশ্বাস ফেলিয়া পালকিতে উঠিয়া বসিলাম, দেখিলাম, বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না—ইহা দূরেও ঠেলিয়া ফেলে। ছোটখাটো প্রেমের সাধ্যও ছিল না—এই সুখৈশ্বর্য-পরিপূর্ণ স্নেহ-স্বর্গ হইতে মঙ্গলের জন্য, কল্যাণের জন্য আমাকে আজ একপদও নড়াইতে পারিত…..”

আমার অবস্থাও তথৈবচ!! তবুও প্রিয়ন্তীরা ভাল থাকুক; 
এ আমার সারাবেলা, অবেলা, কালবেলা অনুক্ষণের ভাবনা, বাসনা ও কামনা।

(দ্রষ্টব্য: আমার লেখা প্রথম ছোট গল্পটি কারুর ব্যক্তি জীবনের সাথে যদি কোন অংশ দৈবাৎ মিলে যায়, তাহলে বিনম্র ক্ষমাপ্রার্থী)
——————————————
লেখক: উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মেহেরপুর।

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More